পরীক্ষামূলক প্রচার

Breaking News

পর্যটন নগরীতে নতুন দিগন্ত: কক্সবাজারে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিনব্যাপী মেগা সফর ও উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ

কক্সবাজার প্রতিনিধি
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

বিশেষ প্রতিনিধি, কক্সবাজার | ১৪ জুন, ২০২৬

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গতকাল শনিবার (১৩ জুন, ২০২৬) দেশের প্রধান পর্যটন নগরী কক্সবাজারে এক ঐতিহাসিক  সফর সম্পন্ন করেছেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই কক্সবাজার জেলায় তাঁর প্রথম আনুষ্ঠানিক সফর। সকাল থেকেই উপকূলীয় অঞ্চলে বৈরী আবহাওয়া এবং ভারী বৃষ্টিপাত উপেক্ষা করে প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে কেন্দ্র করে সমগ্র কক্সবাজার জেলা জুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়।

দিনব্যাপী এই সফরে প্রধানমন্ত্রী কেবল রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, বরং তিনি একাধারে পরিবেশ রক্ষা, স্থানীয় অবকাঠামোগত উন্নয়ন, ইতিহাস পুনরুজ্জীবন এবং জুলাই বিপ্লবের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের মাধ্যমে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত প্রায় ১২ ঘণ্টার এই ঠাসা সূচিতে প্রধানমন্ত্রী বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্পের উদ্বোধন ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।

ঐতিহাসিক 'পাতুলি খাল' পুনঃখনন কাজের উদ্বোধন ও স্বনির্ভরতার বার্তা

গতকাল সকাল ৯:৫৫ মিনিটে প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বিশেষ বিমানটি কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। বিমানবন্দর থেকে তিনি সরাসরি সড়কপথে রওনা হন কক্সবাজার সদর উপজেলার পিএমখালী ইউনিয়নের উদ্দেশ্যে। সেখানে তিনি পরিবেশ ও কৃষির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ 'পাতুলি খাল' পুনঃখনন প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।

উল্লেখ্য, এই পাটলি খালটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। ১৯৭০-এর দশকের শেষভাগে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান গ্রামীণ অর্থনীতি সচল ও সেচ ব্যবস্থার উন্নয়নের লক্ষ্যে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে এই খালটি প্রথম খনন করেছিলেন। দীর্ঘদিন অবহেলায় ভরাট হয়ে যাওয়া এই খালটি পুনরায় খননের মাধ্যমে হাজার হাজার একর ফসলি জমি সেচের আওতায় আসবে।

উদ্বোধন শেষে আয়োজিত এক বিশাল পথসভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন:"জনগণই এদেশের উন্নয়ন ও সার্বভৌমত্বের আসল মালিক। কোনো বিদেশি সাহায্য বা ঋণের ওপর নির্ভর না করে, নিজেদের মেধা ও শ্রম দিয়ে আমাদের অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর হতে হবে। পাতুলি খালের পুনরুজ্জীবন আমাদের সেই স্বনির্ভরতারই একটি প্রতীক।"

জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা: ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির সূচনা

পিএমখালীর কর্মসূচি শেষ করে প্রধানমন্ত্রী সড়কপথে চকরিয়ার মালুমঘাট সংরক্ষিত বনাঞ্চলে পৌঁছান। জলবায়ু পরিবর্তনের চরম ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলকে রক্ষা এবং বনায়ন বৃদ্ধির লক্ষ্যে তিনি সেখানে একটি গাছের চারা রোপণ করে দেশব্যাপী '২৫ কোটি (২৫০ মিলিয়ন) বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি'-র মহতী উদ্বোধন করেন।

এই কর্মসূচির আওতায় আগামী কয়েক বছরে দেশজুড়ে ব্যাপকভাবে ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছ রোপণ করা হবে। পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখার এই উদ্যোগ দেশ-বিদেশে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হচ্ছে। চারা রোপণ শেষে প্রধানমন্ত্রী বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত দেশের অন্যতম প্রধান বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্র ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক পরিদর্শন করেন এবং এর আধুনিকায়নে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেন।

প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ: পেকুয়া পৌরসভা ও মাতামুহুরী উপজেলার ভিত্তিপ্রস্তর

দুপুরের পর প্রধানমন্ত্রী পেকুয়া উপজেলায় প্রবেশ করেন। স্থানীয় জনগণের দীর্ঘদিনের দাবি ও প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের অংশ হিসেবে তিনি সেখানে দুটি বড় ঘোষণা ও প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন: নতুন পেকুয়া পৌরসভা: স্থানীয় নাগরিক সুবিধা বৃদ্ধি এবং পরিকল্পিত নগর গড়ে তোলার লক্ষ্যে নবগঠিত পেকুয়া পৌরসভার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। মাতামুহুরী উপজেলা: চকরিয়া ও পেকুয়ার একটি অংশ নিয়ে গঠিত নতুন 'মাতামুহুরী' উপজেলার প্রশাসনিক কার্যক্রমের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। এই সময় দেশের সমৃদ্ধি ও স্থানীয় মানুষের কল্যাণ কামনায় এক বিশেষ মোনাজাত পরিচালনা করা হয়।

শহীদ পরিবারের প্রতি শ্রদ্ধা: শহীদ ওয়াসিম আকরামের মাজার জিয়ারত

পেকুয়া সফরের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তটি তৈরি হয় যখন প্রধানমন্ত্রী ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের চট্টগ্রাম বিভাগের প্রথম শহীদ মো. ওয়াসিম আকরামের জন্মভূমি মেহেরনামা গ্রামে যান।

প্রধানমন্ত্রী শহীদ ওয়াসিমের কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন এবং তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনা করে মোনাজাত করেন। এরপর তিনি শহীদ ওয়াসিমের শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের সাথে একান্ত বৈঠক করেন। প্রধানমন্ত্রী শহীদের মাতাপিতাকে সান্ত্বনা দেন এবং স্পষ্ট ভাষায় জানান, জুলাই বিপ্লবের শহীদদের আত্মত্যাগ জাতি কোনোদিন ভুলবে না এবং তাঁদের পরিবারকে রাষ্ট্র সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান করবে।

চকরিয়ার গণসমাবেশ ও মেরিন ড্রাইভ পরিদর্শন

বিকেলের দিকে চকরিয়া পৌর বাস টার্মিনাল সংলগ্ন মাঠে কক্সবাজার জেলা বিএনপি আয়োজিত এক ঐতিহাসিক জনসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী। লাখো মানুষের উপস্থিতিতে দেওয়া এই ভাষণে তিনি দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং আগামী দিনের রূপরেখা তুলে ধরেন।

জনসভা শেষে প্রধানমন্ত্রী কক্সবাজারের বিশ্বখ্যাত মেরিন ড্রাইভ সড়ক এবং সমুদ্র সৈকত এলাকা পরিদর্শন করেন। তিনি কক্সবাজারের পর্যটন শিল্পকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার লক্ষ্যে পরিকল্পিত মাস্টারপ্ল্যান তৈরির জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন।

সুধী সমাবেশ ও ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা

সবশেষে, রাতে কলাতলীর লং বিচ হোটেলের কনফারেন্স হলে কক্সবাজারের স্থানীয় প্রশাসন, বীর মুক্তিযোদ্ধা, সুধী সমাজ, ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ এবং সাংবাদিকদের সাথে এক মতবিনিময় সভায় মিলিত হন প্রধানমন্ত্রী। সভায় তিনি কক্সবাজারের সামগ্রিক উন্নয়ন, শুঁটকি ও লবণ শিল্পের আধুনিকায়ন এবং পর্যটন খাতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আশ্বাস দেন।

দিনভর অত্যন্ত ব্যস্ত ও ফলপ্রসূ সফর শেষে রাত ১০টার দিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিমানযোগে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হন। রাজনৈতিক ও উন্নয়নমূলক—উভয় দিক থেকেই প্রধানমন্ত্রীর এই কক্সবাজার সফরকে বর্তমান সরকারের একটি বড় সাফল্য হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

বিষয়:

এলাকার খবর

সম্পর্কিত