পার্বত্য জেলা বান্দরবানে বিএনপির রাজনীতিতে এখন বইছে উত্তাল ঝড়। দলের দীর্ঘদিনের ত্যাগী ও রাজপথের লড়াকু নেত্রীদের চরমভাবে অবমূল্যায়ন করে, সাবেক আওয়ামী লীগ আমলের একজন বিতর্কিত সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটরকে (এপিপি) সংরক্ষিত নারী আসনে সংসদ সদস্য পদে মনোনয়ন দেওয়ায় ক্ষোভে ফুঁসছে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। এই ‘রহস্যজনক’ মনোনয়ন পাহাড়ে বিএনপির অস্তিত্বকেই এখন বড়সড় প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে।
গত সোমবার বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে ৩৬ জন মনোনীত প্রার্থীর নাম ঘোষণার পরপরই বান্দরবানে সমালোচনার ঝড় ওঠে। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন অ্যাডভোকেট মাধবী মার্মা। প্রশ্ন উঠেছে—কোন অদৃশ্য জাদুমন্ত্রে বিএনপির কোনো পদ-পদবি, এমনকি প্রাথমিক সদস্যপদও না থাকা সত্ত্বেও তিনি এই হাই-প্রোফাইল মনোনয়ন পেলেন?যদিও প্রাথমিকভাবে প্রচার করা হয়েছিল তিনি ১/১১-এর সরকারের নিয়োগপ্রাপ্ত, কিন্তু অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে ভিন্ন চাঞ্চল্যকর তথ্য। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর, ০১/১০/২০০৯ তারিখে মাধবী মার্মা স্বয়ং আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) হিসেবে নিয়োগ পান এবং ২০১৫ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী এমন একজনকে বেছে নেওয়ায় দলের ভেতরে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
মাধবী মার্মার মনোনয়নের খবরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার বন্যা বয়ে যাচ্ছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, যিনি কখনোই বিএনপির আন্দোলন-সংগ্রামে ছিলেন না, দলের দুঃসময়ে যাকে পাশে পাওয়া যায়নি, তাকে কেন মূল্যায়ন করা হলো?

জেলা জিয়া সাইবার ফোর্সের নেতারা তাকে ‘অসাধারণ মেধাবী’ বলে তীব্র কটাক্ষ করেছেন। তাদের মতে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে জেলা পরিষদ সদস্য হওয়ার পর এবার সরাসরি এমপির মনোনয়ন পাওয়া কেবল ‘ম্যাজিক’ দিয়েই ব্যাখ্যা করা সম্ভব, রাজনৈতিক যোগ্যতা দিয়ে নয়।
স্থানীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ, শিরীন আক্তার, উম্মে কুলসুম লীনা বা উমেসিং মার্মার মতো অসংখ্য নারী নেত্রী বছরের পর বছর ধরে মামলা, হামলা আর জেল-জুলুম সহ্য করে বান্দরবানে বিএনপির রাজনীতি টিকিয়ে রেখেছেন। রাজপথের এই লড়াকু মুখদের অপমান করে ‘সুসময়ের পাখি’দের ঠাঁই দেওয়া কোনোভাবেই যৌক্তিক হতে পারে না।
ত্যাগী নেতাদের বাদ দিয়ে এই বিতর্কিত মনোনয়ন কি পাহাড়ে বিএনপির রাজনীতিতে বড় কোনো ফাটল ধরাবে? তৃণমূলের এই জ্বলন্ত ক্ষোভ কি কেন্দ্র প্রশমিত করতে পারবে, নাকি এই ক্ষোভের দাবানলে পুড়ে ছারখার হবে দলের সাজানো বাগান—এখন এটাই পার্বত্য জেলা বান্দরবানের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। তৃণমূলের একটাই দাবি, এই মনোনয়ন বাতিল করে দলের পরীক্ষিত নেতাদের মূল্যায়ন করা হোক।
তৃণমূলের শেষ ভরসা কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ও প্রধানমন্ত্রী
বান্দরবানের তৃণমূল নেতাকর্মীদের এখন একমাত্র আশা, চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের আগেই বিষয়টি শীর্ষ নেতৃত্বের নজরে আসবে। সাধারণ নেতাকর্মী ও ত্যাগী নেত্রীদের দাবি, দলের হাইকমান্ড এবং খোদ প্রধানমন্ত্রী যেন এই বিতর্কিত মনোনয়নের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক নারী নেত্রী বলেন,
"আমরা রাজপথে রক্ত দিয়েছি, মামলা খেয়েছি। কিন্তু আজ যখন মূল্যায়নের সময় এলো, তখন এমন একজনকে বেছে নেওয়া হলো যার সাথে দলের কোনো সম্পর্কই নেই। আমরা আশা করছি, গেজেট হওয়ার আগেই আমাদের আবেগের মূল্যায়ন হবে এবং প্রকৃত ত্যাগীদের মনোনয়ন দেওয়া হবে।"
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদি গেজেট পাস হওয়ার আগে এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন না করা হয়, তবে পাহাড়ের রাজনীতিতে বিএনপির জন্য দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এখন দেখার বিষয়, তৃণমূলের এই হাহাকার কেন্দ্রের কানে পৌঁছায় কি না।