দীর্ঘ প্রায় দুই বছরের অনিশ্চয়তা, বাস্তুচ্যুত জীবন আর স্বদেশে ফেরার অপেক্ষার অবসান ঘটেছে। ভারতের মিজোরামে আশ্রয় নেওয়া বম জনগোষ্ঠীর তিনটি পরিবার ফিরে এসেছে বাংলাদেশে। জন্মভূমির মাটিতে পা রেখেই শিশুদের হাতে তুলে দেওয়া হয় বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা। লাল-সবুজের পতাকা হাতে তাদের মুখে ফুটে ওঠে বিস্ময়, স্বস্তি ও আবেগ—যেন দীর্ঘদিনের অচেনা স্বদেশকে প্রথমবার নিজের করে পাওয়ার অনুভূতি।
ফিরে আসা পরিবারগুলোর শিশুদের কাছে এই মুহূর্ত ছিল অন্যরকম। তাদের কেউ কেউ এত অল্প বয়সে বাংলাদেশ ছেড়েছিল যে জন্মভূমির কোনো স্মৃতিই তাদের নেই। এমনকি ফিরে আসা একটি শিশুর জন্ম হয়েছে ভারতের মিজোরামে। বাবা-মায়ের কাছে বাংলাদেশ ছিল তাদের স্বদেশ, পূর্বপুরুষের ভূমি; কিন্তু শিশুদের কাছে তা ছিল অনেকটা গল্পের মতোই। সেই স্বদেশকে এবার তারা প্রথমবার দেখল, স্পর্শ করল এবং বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা হাতে দাঁড়াল।
জাতীয় পতাকা হাতে ছোট্ট শিশুদের সেই দৃশ্য উপস্থিত সবার মধ্যেই তৈরি করে আবেগঘন পরিবেশ। দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতার পর স্বদেশে ফেরার আনন্দে পরিবারগুলোর মধ্যেও ছিল স্বস্তির অনুভূতি।
জানা যায়, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিরাজমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি ও নিরাপত্তাজনিত আশঙ্কার কারণে বম জনগোষ্ঠীর তিনটি পরিবার বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতের মিজোরামে আশ্রয় নেয়। নিরাপদ আশ্রয়ের প্রত্যাশায় দেশ ছাড়লেও সেখানে দীর্ঘ সময় তাদের কাটাতে হয় অনিশ্চয়তার মধ্যে। জন্মভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তারা অপেক্ষা করতে থাকে দেশে ফেরার উপযুক্ত সময়ের জন্য।
পরবর্তীতে পার্বত্য চট্টগ্রামের সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতির পাশাপাশি বম জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন ও জীবনমান উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। মিজোরামে অবস্থানরত পরিবারগুলোর কাছে বিভিন্ন মাধ্যমে দেশের পরিস্থিতি ও নিরাপদে ফিরে আসার বিষয়ে বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়। বম সমাজের সহযোগিতায় নেওয়া এসব উদ্যোগের ফলে পরিবারগুলোর মধ্যে আস্থা তৈরি হয়। একপর্যায়ে তারা স্বদেশে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেয়।
গত ১২ সেপ্টেম্বরে তারা মিজোরাম-হরিণা-রাঙামাটি হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। পরদিন ১৩ সেপ্টেম্বর সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে রাঙামাটি থেকে তাদের বাকলাইপাড়া সাব-জোনের আওতাধীন এলাকায় নিয়ে আসা হয়। পরে ১৪ সেপ্টেম্বর সকালের নিজ নিজ বাড়িতে চলে যায়।বাকলাইপাড়া ক্যাম্পে পৌঁছালে তাদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়। এ সময় পরিবারের সদস্যদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও আশ্বাস দেওয়া হয়।
পুনর্বাসন ও জীবনযাত্রাকে সহজ করতে বাকলাইপাড়া সাব-জোনের পক্ষ থেকে প্রতিটি পরিবারকে শুকনো রসদ, নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী, সোলার প্যানেল ও ব্যাটারি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতেও তাদের স্বাভাবিক জীবন পুনর্গঠনে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘ প্রায় দুই বছর পর তিনটি বম পরিবারের এই প্রত্যাবর্তন শুধু কয়েকটি পরিবারের ঘরে ফেরার ঘটনা নয়; এটি স্বদেশের প্রতি মানুষের গভীর টান, নিরাপদ জীবনের প্রত্যাশা এবং আস্থার এক মানবিক গল্প। যে শিশুরা বাংলাদেশের মাটিকে কখনো দেখেনি, তারাই আজ সেই মাটিতে দাঁড়িয়ে হাতে তুলে নিয়েছে লাল-সবুজের পতাকা।
মিজোরামের অনিশ্চিত দিনগুলো পেছনে ফেলে পূর্বপুরুষের ভূমিতে ফিরে আসা পরিবারগুলোর চোখে এখন নতুন স্বপ্ন। আর জাতীয় পতাকা হাতে সেই শিশুদের মুহূর্ত যেন বলে দেয়—স্বদেশ কখনো অচেনা থাকে না; সময়ের ব্যবধানে হারিয়ে গেলেও শিকড়ের টান মানুষকে শেষ পর্যন্ত ফিরিয়ে আনে আপন মাটিতে।