পরীক্ষামূলক প্রচার

Breaking News

কক্সবাজার-বান্দরবানে ইয়াবা ঠেকাতে নতুন কৌশল পুলিশের

ডেক্স রিপোর্ট
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
কক্সবাজার-বান্দরবান সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা পাচার ঠেকাতে এআই ক্যামেরা, স্ক্যানার ও ডগ স্কোয়াডসহ স্থায়ী তল্লাশিচৌকি স্থাপনের পরিকল্পনা করেছে পুলিশ। ছবি: সংগৃহীত
কক্সবাজার-বান্দরবান সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা পাচার ঠেকাতে এআই ক্যামেরা, স্ক্যানার ও ডগ স্কোয়াডসহ স্থায়ী তল্লাশিচৌকি স্থাপনের পরিকল্পনা করেছে পুলিশ। ছবি: সংগৃহীত

কক্সবাজার ও বান্দরবানের সীমান্ত এলাকা দিয়ে প্রতিনিয়ত দেশে ঢুকছে ইয়াবা। মিয়ানমার সীমান্ত পেরিয়ে পাহাড়ি পথ, ভাঙা সড়ক ও অলিগলি ঘুরে এই মাদক পৌঁছে যাচ্ছে কক্সবাজার শহরসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান ও জব্দের পরিমাণ বাড়লেও থামছে না ইয়াবার প্রবাহ। ফলে পাচারের নতুন নতুন পথ ও কৌশল ঠেকাতে এবার সীমান্ত থেকে শহর পর্যন্ত পুরো পথকে নজরদারির আওতায় আনার পরিকল্পনা করছে পুলিশ।

এই পরিকল্পনার কেন্দ্রে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি। কক্সবাজার ও বান্দরবানের গুরুত্বপূর্ণ ১১টি স্থানে স্থায়ী তল্লাশিচৌকি স্থাপনের প্রস্তাব তৈরি করেছে চট্টগ্রাম রেঞ্জ পুলিশ। এসব চৌকিতে থাকবে এআই প্রযুক্তির মুখ শনাক্তকারী ক্যামেরা, সাধারণ সিসিটিভি, মাদক শনাক্তকারী ডগ স্কোয়াড এবং যানবাহন ও লাগেজ পরীক্ষার জন্য স্ক্যানার।

গত ২৭ জুলাই প্রস্তাবটি পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, চৌকিগুলো পরিচালনায় ৩২১ জন পুলিশ সদস্য প্রয়োজন হবে। পাশাপাশি যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৩ কোটি টাকা।

জব্দের পরও থামছে না ইয়াবা

পুলিশের প্রস্তাবের পেছনে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ইয়াবা জব্দের পরিসংখ্যান। ২০২৫ সাল থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত সীমান্তরক্ষী বাহিনী একাই দেড় কোটির বেশি ইয়াবা বড়ি জব্দ করেছে। একই সময়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের হাতে ধরা পড়েছে সাড়ে চার কোটির বেশি ইয়াবা।

এত বিপুল পরিমাণ ইয়াবা জব্দের পরও পাচার বন্ধ না হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মনে করছে, শুধু সীমান্তে অভিযান চালিয়ে এই প্রবাহ ঠেকানো সম্ভব নয়। সীমান্ত পার হওয়ার পর মাদক যেসব বিকল্প সড়ক ও পাহাড়ি পথ দিয়ে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে, সেসব রুটও নজরদারির আওতায় আনতে হবে।

সীমান্তের পরের পথেও নজরদারি

চট্টগ্রাম রেঞ্জ পুলিশের প্রস্তাব অনুযায়ী, কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ এবং বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তকে ইয়াবা প্রবেশের সবচেয়ে সংবেদনশীল এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

পুলিশের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে নাফ নদী, সমুদ্রপথ ও বিভিন্ন সীমান্তবর্তী পয়েন্ট দিয়ে ইয়াবা বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এরপর পাচারকারীরা বিকল্প সড়ক ও পাহাড়ি পথ ব্যবহার করে মাদক দেশের বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে যায়।

এ কারণে মূল সড়কের সঙ্গে পাহাড়ি ও বিকল্প সড়কগুলোর সংযোগস্থলে স্থায়ী চেকপোস্ট স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। কক্সবাজারের রামু, সদর, উখিয়া ও চকরিয়ার সাতটি এবং বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির চারটি স্থানকে এ জন্য প্রাথমিকভাবে নির্বাচন করা হয়েছে।

সবচেয়ে বড় চৌকি মেরিন ড্রাইভের শেষ প্রান্তে

প্রস্তাবিত ১১টি চৌকির মধ্যে সবচেয়ে বড় পরিসরে একটি চৌকি স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছে মেরিন ড্রাইভের শেষ প্রান্তের গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থানে। পুলিশ মনে করছে, কক্সবাজার শহর ও পর্যটন এলাকায় মাদক প্রবেশ ঠেকাতে এই পয়েন্টটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এখানে তিন পালায় দায়িত্ব পালন করবেন ৪২ জন পুলিশ সদস্য। থাকবে একটি ডগ স্কোয়াড, লাগেজ ও ভেহিক্যাল স্ক্যানার, তিনটি এআই মুখ শনাক্তকারী ক্যামেরা এবং ১৫টি সাধারণ সিসিটিভি ক্যামেরা। এই চৌকির অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৭ লাখ টাকা।

পুরোনো ও বিকল্প রুটও থাকবে নজরদারিতে

শুধু প্রধান সড়ক নয়, পুরোনো ও কম পরিচিত পথগুলোকেও নজরদারির আওতায় আনার পরিকল্পনা করেছে পুলিশ।

উখিয়ার বনবিভাগ সংলগ্ন একটি পুরোনো সড়ককে গুরুত্বপূর্ণ রুট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পুলিশের ধারণা, টেকনাফ ও উখিয়া থেকে পুরোনো সড়ক ব্যবহার করে মাদক পরিবহনের চেষ্টা করা হতে পারে। সেখানে ৩৩ সদস্যের একটি চৌকি স্থাপনের প্রস্তাব রয়েছে।

এ ছাড়া রামুর একটি বৌদ্ধবিহার সংলগ্ন এলাকা এবং গর্জনিয়ার একটি চৌরাস্তার মোড়কেও গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এসব এলাকা দিয়ে পার্বত্য অঞ্চল ও দুর্গম বনাঞ্চল থেকে আসা মাদক মূল সড়কে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছে পুলিশ।

নাইক্ষ্যংছড়িতে বিশেষ নজর

বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্ত এলাকায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সীমান্তঘেঁষা সরু পাহাড়ি পথ দিয়ে মাদক পরিবহনের আশঙ্কা থাকায় এখানে তিনটি পৃথক স্থায়ী চৌকি স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রতিটি চৌকিতে ৩৩ জন করে পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। এর একটি চৌকি থানা থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দূরের একটি পাহাড়ি সংযোগস্থলে স্থাপনের প্রস্তাব রয়েছে। এলাকাটি মাদক পরিবহনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করেছে পুলিশ।

আরেকটি চৌকি বসানোর কথা রয়েছে চার রাস্তার একটি মিলনস্থলে। পুলিশের ধারণা, সেখানে যানবাহন থামিয়ে তল্লাশি চালানো তুলনামূলকভাবে সহজ হবে।

৩১ এআই ক্যামেরা, ১৪০ সিসিটিভি

পুরো পরিকল্পনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে প্রযুক্তিকে। ১১টি চৌকিতে মোট ৩১টি এআই-ভিত্তিক মুখ শনাক্তকারী ক্যামেরা এবং ১৪০টি সাধারণ সিসিটিভি ক্যামেরা বসানোর প্রস্তাব রয়েছে।

এআই ব্যবস্থায় সন্দেহভাজন মাদক কারবারি ও তাদের সহযোগীদের ছবি আগে থেকেই সংরক্ষণ করা থাকবে। ফলে কোনো ব্যক্তি চৌকির ক্যামেরার আওতায় প্রবেশ করলে প্রযুক্তির মাধ্যমে তার পরিচয় শনাক্ত করার চেষ্টা করা হবে।

এর পাশাপাশি থাকবে ছয়টি ভেহিক্যাল স্ক্যানিং মেশিন ও আটটি লাগেজ স্ক্যানার। ছয়টি গাড়ি স্ক্যানারের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় সাড়ে নয় কোটি টাকা। আর আটটি লাগেজ স্ক্যানারের জন্য প্রস্তাবিত ব্যয় প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা।

এ ছাড়া এআই ফেস ডিটেকশন সফটওয়্যার, মনিটরিং ব্যবস্থা ও বড় পর্দার ডিসপ্লে স্থাপনের খরচও প্রস্তাবে রাখা হয়েছে।

শুধু অভিযান নয়, বন্ধ করতে হবে পাচারের রুট

মাদকবিরোধী এই পরিকল্পনাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কাজ করা একটি সংগঠনের চট্টগ্রাম শাখার প্রতিনিধি। তাঁর মতে, শুধু অভিযান চালিয়ে মাদক নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়; বরং মাদক পাচারের রুটগুলো বন্ধ করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।

তিনি বলেন, একটি পথ বন্ধ হলে কারবারিরা দ্রুত অন্য পথ খুঁজে নেয়। তাই সীমান্ত, পাহাড়ি পথ, বিকল্প সড়ক, রেলপথ এবং শহরে প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে সমন্বিত নজরদারি প্রয়োজন। কোথাও ঘাটতি থাকলে পুরো মাদক চক্র ভাঙা কঠিন হবে।

বাস্তবায়নের অপেক্ষায় প্রস্তাব

তবে চট্টগ্রাম রেঞ্জ পুলিশের এই পরিকল্পনা এখনো বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে। গত ২৭ জুলাই পুলিশ সদর দপ্তরে প্রস্তাব পাঠানো হলেও এর পরবর্তী অগ্রগতি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

ফলে কবে নাগাদ এসব স্থায়ী চৌকি বাস্তবে চালু হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে সীমান্ত থেকে শহর পর্যন্ত একাধিক ধাপে নজরদারির বলয় তৈরি হবে। পুলিশের লক্ষ্য—দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশের আগেই ইয়াবার চালান আটকে দেওয়া।

বিষয়:

এলাকার খবর

সম্পর্কিত