পরীক্ষামূলক প্রচার

Breaking News

পাহাড়ে শত একরের ফলদ বাগানে সম্ভাবনার হাতছানি: পানির তীব্র সংকটে কাঙ্ক্ষিত ফলন থেকে বঞ্চিত কৃষকরা

নিজস্ব প্রতিবেদক
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি: গিরিকণ্ঠ
ছবি: গিরিকণ্ঠ

বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলায় পাহাড়ের ঢালে গড়ে ওঠা শত একরের মিশ্র ফলদ বাগানগুলো ঘিরে স্থানীয় কৃষকদের মনে নতুন স্বপ্নের বীজ বুনলেও সেচের পানির তীব্র সংকট তাদের সেই স্বপ্নকে ম্লান করে দিচ্ছে। আম্রপালি, লিচু, কিউজাই, মিয়াজাকি, সূর্য ডিম, কাজুবাদাম থেকে শুরু করে লটকন ও কুলের মতো বহুমুখী ফল চাষ করে স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে গেলেও পর্যাপ্ত পানির অভাবে কাঙ্ক্ষিত ফলন না পেয়ে চরম আর্থিক লোকসানের মুখে পড়েছেন চাষিরা।

উপজেলা সদর থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বেংছড়ি, খাব্রে, অংজাই, লুংলাই, বিক্রমণী ও মুনথার পাড়ার প্রায় ৯২টি পরিবার এই ভয়াবহ সংকটের শিকার। এসব এলাকার বিভিন্ন পরিবার পাঁচ থেকে ১৫ একর পর্যন্ত জমিতে মিশ্র ফলদ বাগান গড়ে তুলেছেন। কিন্তু সেচ ব্যবস্থার বেহাল দশার কারণে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে করা বিনিয়োগ ও কঠোর পরিশ্রম আজ লোকসানের বোঝায় পরিণত হয়েছে।

বাগানগুলোতে পানির একমাত্র উৎস ঝিরিগুলো রয়েছে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে। সেখান থেকে শ্রমিক দিয়ে পাহাড়ি পথ বেয়ে পানি বহন করে আনতে প্রতি লিটারে খরচ পড়ে প্রায় দুই টাকা। ক্ষুদ্র ও প্রতিদিনের আয়ের ওপর নির্ভরশীল মাঝারি চাষিদের পক্ষে এই বিশাল ব্যয় বহন করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে বাধ্য হয়ে গাছের প্রয়োজন থাকলেও অনেক সময় পর্যাপ্ত পানি দিতে পারছেন না তাঁরা।

পাহাড়ে নিজের জমিতে গড়ে ওঠা বাগানের দুরবস্থা নিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করে চাষি চশৈনু মারমা বলেন, “দিনরাত পরিশ্রম করেও পানির অভাবে চোখের সামনে বাগান শুকিয়ে যেতে দেখি। ঠিকমতো সেচ দিতে পারলে উৎপাদন এখনকার তুলনায় তিন গুণ বাড়ত, ফলের স্বাদ ও মানও অনেক ভালো হতো। সরকারের কাছে আমাদের একটাই আকুতি, দ্রুত একটি স্থায়ী পানির ব্যবস্থা করে দেওয়া হোক।” আরেক চাষি উবায়ই মারমা জানান, শীতকাল এলে পানির এই কষ্ট চরমে পৌঁছায়। স্ত্রীসহ সারাদিন বাগানে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেও পানির অভাবে আশানুরূপ ফলন না পাওয়ায় ঋণের বোঝা শুধু বেড়েই চলেছে।

শুরুর এই শীতকালীন পানির সংকট মোকাবিলায় মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. মাহবুবুল ইসলাম পাহাড়ে হাফ-মুন কাটিং পদ্ধতি অনুসরণ এবং বর্ষার শুরুতে মালচিং উপকরণ দিয়ে গাছের গোড়ার আর্দ্রতা ধরে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। পাশাপাশি বিকল্প হিসেবে ড্রিপ ইরিগেশন বা একাধিক চাষিকে একত্রিত করে সৌরশক্তিচালিত (সোলার) সেচব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।

কৃষকদের এই দুর্ভোগ নিরসনে ইতিবাচক পদক্ষেপের কথা জানিয়েছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বান্দরবান জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক আবু নঈম মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন। তিনি জানান, কৃষকদের সেচ সংকট কাটাতে নতুন অর্থবছরে পানির সরবরাহ নিশ্চিত করার বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, যার মধ্যে সৌরবিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্প স্থাপনের বিশেষ প্রস্তাবও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। স্থানীয় জেলা পরিষদ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে খুব শীঘ্রই একটি টেকসই সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

পাহাড়ের মাটি ও অনুকূল আবহাওয়াকে কাজে লাগিয়ে গড়ে ওঠা এই সবুজ বাগানগুলো কেবল কয়েকটি পরিবারের জীবিকার মাধ্যমই নয়, বরং এটি পাহাড়ি কৃষির অপার সম্ভাবনার প্রতীক। এখন শুধু প্রয়োজন উপযুক্ত সেচ অবকাঠামো ও দ্রুত প্রশাসনিক সহায়তা—তাহলে পাহাড়ি কৃষকের এই কষ্টের ঘাম এক দিন রূপ নিতে পারে সোনালি ফসলের হাসিতে।

বিষয়:

এলাকার খবর

সম্পর্কিত