প্রকাশ :: ... | ... | ...

সাম্য, দ্রোহ ও প্রেমের রূপকার কাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে চাইন্দা ক্যাফেতে নজরুল প্রেমীদের মিলনমেলা


সংযুক্ত ছবি

আজ বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মজয়ন্তী। | ছবি: গিরিকন্ঠ

আজ ২৩ মে, ২০২৬। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জ্যোতিষ্ক, বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মজয়ন্তী। বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির এমন কোনো শাখা নেই, যেখানে এই মহান পুরুষের ছোঁয়া লাগেনি। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার গান গেয়ে তিনি যেমন হয়েছেন ‘বিদ্রোহী কবি’, তেমনি হৃদয়ের গভীর আকুতি দিয়ে লিখেছেন কালজায়ী প্রেমের কবিতা ও গান। জন্ম ও শৈশব: ১৮৯৯ সালের ২৪ মে (১১ জ্যৈষ্ঠ, ১৩০৬ বঙ্গাব্দ) ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে এক দরিদ্র মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন নজরুল। তাঁর পিতার নাম কাজী ফকির আহমেদ এবং মাতার নাম জাহেদা খাতুন। পিতার অকাল মৃত্যুর পর চরম দারিদ্র্যের মধ্যে কাটে তাঁর শৈশব, যে কারণে তাঁর ডাকনাম ছিল ‘দুখু মিয়া’।জীবিকার তাগিদে কিশোর বয়সেই তিনি ল্যাটোর দলে যোগ দেন, রুটির দোকানে কাজ করেন এবং পরবর্তীতে রেলওয়ে গার্ডের বাবুর্চি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। এই প্রতিকূলতাই তাঁর ভেতরের কবিসত্তাকে জাগিয়ে তোলে এবং সাধারণ মানুষের জীবনের সাথে তাঁকে গভীরভাবে পরিচিত করায়। সৈনিক জীবন ও সাহিত্যে আত্মপ্রকাশ প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন ১৯১৭ সালে নজরুল ৪১ নম্বর বাঙালি পল্টনে যোগ দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে (বর্তমানে পাকিস্তানে) যান। সেখানে বসেই তাঁর সাহিত্যচর্চার মূল ভিত্তি তৈরি হয়। যুদ্ধ শেষে ১৯২০ সালে কলকাতায় ফিরে তিনি পুরোপুরি সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় আত্মনিয়োগ করেন। ‘নবযুগ’ ও ‘ধূমকেতু’ পত্রিকার মাধ্যমে তাঁর ক্ষুরধার লেখনী ব্রিটিশ রাজের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল। ‘বিদ্রোহী’ কবি ও কারাবরণ ১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসে নজরুল রচনা করেন তাঁর কালজায়ী কবিতা ‘বিদ্রোহী’। এই একটি কবিতাই বাংলা সাহিত্যে তাঁর স্থান চিরস্থায়ী করে দেয়। অন্যায়, অত্যাচার ও পরাধীনতার বিরুদ্ধে তাঁর এই তীব্র প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর তৎকালীন তরুণ সমাজকে আলোড়িত করেছিল। ব্রিটিশ বিরোধী লেখার জন্য ১৯২৩ সালে তাঁকে কারাবরণ করতে হয়, যেখানে তিনি রাজবন্দীদের অধিকার আদায়ের জন্য ৪০ দিন অনশন করেছিলেন। নজরুল সঙ্গীত: সুরের এক বিশাল সমুদ্র কাজী নজরুল ইসলাম কেবল কবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন একাধারে গীতিকার, সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক। তিনি প্রায় ৩,০০০-এর বেশি গান রচনা করেছেন, যা আজ ‘নজরুল গীতি’ নামে পরিচিত। তিনি বাংলা গানে গজল, ঠুমরি ও খেয়ালের সার্থক প্রয়োগ করেন। একদিকে তিনি যেমন লিখেছেন কালজায়ী ইসলামি গজল ও হামদ-নাত, অন্যদিকে তেমনি রচনা করেছেন চমৎকার সব শ্যামা সঙ্গীত ও ভজন। তাঁর সৃষ্টিতে ফুটে উঠেছে অসাম্প্রদায়িক চেতনার চিরন্তন রূপ। শেষ জীবন ও বাংলাদেশে আগমন দুর্ভাগ্যবশত, ১৯৪২ সালে মাত্র ৪৩ বছর বয়সে কবি এক দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হন এবং চিরতরে বাকশক্তি ও মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর, ১৯৭২ সালের ২৪ মে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে কবিকে সপরিবারে স্বাধীন বাংলাদেশে আনা হয় এবং তাঁকে ‘জাতীয় কবি’র মর্যাদায় ভূষিত করা হয়। ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডি.লিট ডিগ্রি প্রদান করে এবং ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ‘একুশে পদক’ ও নাগরিকত্ব দেয়। ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট (১২ ভাদ্র, ১৩৮৩ বঙ্গাব্দ) ঢাকার তৎকালীন পিজি হাসপাতালে (বর্তমানে বিএসএমএমইউ) এই মহান কবি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁরই একটি গানের আকুতি অনুসারে—“মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিও ভাই”—তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়। আজকের এই দিনে, কবি নজরুলের ১২৭তম জন্মজয়ন্তীতে আমাদের অঙ্গীকার হোক তাঁর অসাম্প্রদায়িক চেতনা, সাম্যবাদ এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন মনোভাবকে বুকে ধারণ করে একটি সুন্দর সমাজ গড়ে তোলা। আজ শনিবার (২৩ মে, ২০২৬) সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত বান্দরবানের অন্যতম জনপ্রিয় স্পট ‘চাইন্দা ক্যাফে অ্যান্ড রিসোর্ট’-এ এই মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। প্রকৃতির কোলে, শান্তির নিবিড় ছোঁয়ায় ঘেরা এই ভেন্যুতে নজরুলপ্রেমীদের এক বিশাল মিলনমেলা বসবে বলে আশা করছেন আয়োজকরা।