| ছবি: গিরিকণ্ঠ
বান্দরবানের লামা বন বিভাগের কর্মকর্তা ও স্থানীয় বৈধ গাছ ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তুলে একের পর এক আদালতে মামলা করার অভিযোগ উঠেছে। মামলার ভয় দেখিয়ে জিম্মি করে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার এই অভিযোগ উঠেছে মো. উসমান গণি নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। অভিযুক্ত উসমান গণি লামা পৌরসভা এলাকার নয়াপাড়ার বাসিন্দা নুর মোহাম্মদের ছেলে। তার এই হয়রানিমূলক কর্মকাণ্ডে চরম অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন বন কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীরা। লামা বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, উসমান গণি একজন চিহ্নিত বনদস্যু। গত ২০২৫ সালের ২৯ জুন লামা বন বিভাগের আওতাধীন আলীকদম উপজেলার তৈন রেঞ্জের কাঁকড়া ঝিরি এলাকায় সংরক্ষিত বনের সেগুন গাছ কেটে পাচারের সময় বন বিভাগের টহল দলের হাতে তিনি হাতেনাতে ধরা পড়েন। সরকারি বনভূমিতে অবৈধ অনুপ্রবেশ করে গাছ কর্তন ও চুরির চেষ্টার অভিযোগে ওই দিনই তার বিরুদ্ধে বন বিভাগ আদালতে মামলা দায়ের করে। ওই মামলায় তিনি দীর্ঘদিন জেলও খেটেছেন এবং বর্তমানে মামলাটি সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে। জেল থেকে বেরিয়ে কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা: কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে আরও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন উসমান গণি। গত ১৬ জুলাই তিনি বান্দরবান চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলি আদালত-৩ এ লামা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান, রেঞ্জ কর্মকর্তা কে এম কবির উদ্দিন, গাছ ব্যবসায়ী রেজাউল করিম বাবলু ও রিকশাচালক রশিদ আহমদের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেন। এর আগে ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর উপজেলার গাছ ব্যবসায়ী ওমর ফারুক বেচু, আব্দুল জলিল, দেলোয়ারসহ অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট লামা চৌকি আদালতে আরও একটি মামলা করেছিলেন তিনি। তবে ওই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও থানা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) সালাহ উদ্দিন গত ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মামলার অভিযোগের সপক্ষে সুনির্দিষ্ট ও নির্ভরযোগ্য কোনো সাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং অজ্ঞাতনামা বিবাদীদের নাম-ঠিকানাও সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। ফলে বিজ্ঞ আদালত মামলাটি খারিজ করে দেন। এছাড়া ২০২৫ সালের ২৫ নভেম্বর তৈন রেঞ্জের কর্মকর্তা খন্দকার আরিফুল ইসলামসহ গাছ ব্যবসায়ী ও দুই শ্রমিকের বিরুদ্ধেও থানায় জিডি করেছিলেন তিনি। ভুক্তভোগী গাছ ব্যবসায়ী রেজাউল করিম বাবলু অভিযোগ করে বলেন, "এই নিয়ে উসমান গণি আমার কাছ থেকে তিন দফায় মোট ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা নিয়েছেন। টাকা নেওয়ার সময় তিনি দুইবার লিখিত অঙ্গীকারনামাও দিয়েছেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে, আমার সঙ্গে তাঁর কোনো দাবি-দাওয়া বা বিরোধ নেই এবং ভবিষ্যতে কোনো মামলা-মোকদ্দমা করবেন না। কিন্তু তিনি চুক্তি ভঙ্গ করে একের পর এক মামলা দিয়ে হয়রানি ও টাকা আদায় অব্যাহত রেখেছেন।" অপর ভুক্তভোগী গাছ ব্যবসায়ী ওমর ফারুক বেচু ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, উসমান গণি সবসময় গাছ চুরির সঙ্গে জড়িত। তাকে অপরাধ থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করায় সে ক্ষিপ্ত হয়ে এলাকার অসংখ্য ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করছে। তার অত্যাচারে সাধারণ ব্যবসায়ীরা আজ দিশেহারা। লামা বন বিভাগের সদর রেঞ্জ কর্মকর্তা কে এম কবির উদ্দিন বলেন, "আমি লামায় কর্মস্থলে যোগদান করেছি ২০২৫ সালের ৭ ডিসেম্বর। অথচ ৯ ডিসেম্বর উসমান আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনেন যে, আমি নাকি ওই দিন তাকে লামা বাজার থেকে তুলে এনে মারধর করেছি! অথচ একটি নতুন জায়গায় যোগদানের পর পরিবেশ ও লোকজনকে চিনতেই কয়েক মাস সময় লাগে, সেখানে একদিনের মধ্যে আমি কীভাবে তাকে চিনব? মূলত আমাকে ও বন বিভাগকে হয়রানি করার জন্য দুষ্কৃতকারীদের কুবুদ্ধিতে সে এই মিথ্যা মামলা করেছে।" তৈন রেঞ্জের কর্মকর্তা খন্দকার আরিফুল ইসলাম জানান, বন আইনে মামলা করার কারণে উসমান গণি আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। চিহ্নিত একটি বনদস্যু চক্র তাকে উসকে দিচ্ছে। একদিকে বন বিভাগের জনবল সংকট, অন্যদিকে এই চক্রের একের পর এক মিথ্যা মামলার কারণে বনায়ন ও বন রক্ষায় মারাত্মক বিঘ্ন ঘটছে। এদিকে সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে অভিযুক্ত উসমান গণি বলেন, "আমার বিরুদ্ধে বন বিভাগ মামলা দিয়েছে, তাই আমিও মামলা করেছি। তাতে কী হয়েছে? আমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কোনো টাকা-পয়সা নিইনি।"