প্রকাশ :: ... | ... | ...

পার্বত্য চট্টগ্রামে ছয় মাসে ধারাবাহিক অস্ত্র উদ্ধার, বাড়ছে নিরাপত্তা উদ্বেগ


সংযুক্ত ছবি

| ছবি: গিরিকণ্ঠ

রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি-বান্দরবানে সেনাবাহিনী ও বিজিবির অভিযানে অস্ত্র-গোলাবারুদ উদ্ধার পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে গত ছয় মাসে (মার্চ-আগস্ট ২০২৬) নিরাপত্তা বাহিনীর একাধিক অভিযানে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র, গোলাবারুদ ও সামরিক সরঞ্জাম উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। এসব অভিযানের বেশ কয়েকটিতে পার্বত্য অঞ্চলের সশস্ত্র আঞ্চলিক সংগঠনের সদস্যদের সম্পৃক্ততার কথা জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বিশেষ করে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ), জেএসএসের একটি অংশসহ বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর কার্যক্রমকে ঘিরে পাহাড়ে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজি, সশস্ত্র অবস্থান ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ও ক্ষোভের অভিযোগও রয়েছে। খাগড়াছড়িতে AK-22 ও গোলাবারুদ উদ্ধার গত ১৬ মে খাগড়াছড়ির রামগড় উপজেলার বুদংছড়া এলাকায় সেনাবাহিনী ও পুলিশের যৌথ অভিযানে তিনজনকে আটক করা হয়। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে তাদের ইউপিডিএফের সদস্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযানে একটি AK-22 রাইফেল, পাঁচ রাউন্ড তাজা গুলি, একটি ম্যাগাজিন, ওয়াকিটকি ও চাঁদা আদায়ের রশিদ উদ্ধারের কথা জানানো হয়। ঘটনাটি পাহাড়ে সশস্ত্র সংগঠনগুলোর অস্ত্রধারণ ও চাঁদাবাজির অভিযোগকে আবারও সামনে নিয়ে আসে। জুনে পানছড়ি ও রামগড়ে বড় ধরনের অস্ত্র উদ্ধার ২৩ ও ২৪ জুন খাগড়াছড়ির পানছড়ি ও রামগড় উপজেলায় নিরাপত্তা বাহিনীর পৃথক অভিযানের খবর পাওয়া যায়। এসব অভিযানে গুলি বিনিময়ের ঘটনা, সদস্যদের আত্মসমর্পণ এবং অস্ত্র-গোলাবারুদ উদ্ধারের কথা জানানো হয়। রামগড়ের হাজাছড়া এলাকায় অভিযানের সময় গুলি বিনিময়ে একজন নিহত হন বলে জানানো হয়। পরে ঘটনাস্থল থেকে একটি AK-47 রাইফেল, একটি ম্যাগাজিন, একটি পাইপগান ও গোলাবারুদসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধারের কথা বলা হয়। বান্দরবানের দুর্গম এলাকায় যৌথ আস্তানায় অভিযান ২৮ জুন বান্দরবানের দুর্গম রেথলাং এলাকায় ইউপিডিএফ (মূল) ও কেএনএফের একটি কথিত যৌথ আস্তানায় বিশেষ অভিযান পরিচালনার কথা জানানো হয়। অভিযানে বিপুল পরিমাণ সামরিক সরঞ্জাম ও অস্ত্র উদ্ধারের তথ্য পাওয়া যায়। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা এবং সীমান্তবর্তী ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বান্দরবানের বিভিন্ন অংশে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অবস্থান ও চলাচল নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য বিশেষ চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আগস্টে রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে ফের অস্ত্র উদ্ধার ২৪ আগস্ট রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক থানাধীন মাচলং এলাকায় অভিযান চালিয়ে একটি এলজি (লোকাল গান), দুই রাউন্ড তাজা কার্তুজ ও দেশীয় অস্ত্র উদ্ধারের কথা জানানো হয়। অভিযানে অস্ত্রগুলো জেএসএস (সন্তু লারমা)-এর আস্তানা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়। এর পরদিন, ২৫ আগস্ট খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার ভাইবোনছড়া এলাকায় ইউপিডিএফ (মূল)-এর কথিত গোপন আস্তানায় অভিযান চালিয়ে একটি বিদেশি পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন ও চার রাউন্ড গুলি উদ্ধারের তথ্য জানানো হয়। থানচিতে চাঁদাবাজির অভিযোগে ব্যবসায়ীদের প্রতিবাদ এদিকে চলতি আগস্টে বান্দরবানের থানচিতে চাঁদাবাজির অভিযোগকে কেন্দ্র করে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, থানচি উপজেলার চাঁদের গাড়ি মালিক সমিতির কাছে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পিসিজেএসএসের পক্ষ থেকে ছয় লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। পরে সমিতির পক্ষ থেকে তিন লাখ টাকা দেওয়ার পরও বিভিন্ন স্থানে মালবাহী গাড়ি আটকে হয়রানি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এর প্রতিবাদে থানচি বাজারের ব্যবসায়ীরা কাঁচামাল ও খাদ্যসামগ্রী কেনাবেচা এবং মালবাহী গাড়ি চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। পাহাড়ি উৎপাদকদের কাছ থেকে কলাসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য কেনাবেচাও এতে ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সীমান্তঘেঁষা পাহাড়ে নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন গত ছয় মাসের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামে অস্ত্র উদ্ধার ও সশস্ত্র তৎপরতার অভিযোগ একেবারে বিচ্ছিন্ন নয়। খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানের দুর্গম ও সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে বিভিন্ন সময়ে অস্ত্র উদ্ধার, গুলি বিনিময়, চাঁদাবাজি ও সশস্ত্র অবস্থানের খবর সামনে এসেছে। তবে এসব অস্ত্রের প্রকৃত উৎস, সীমান্তপথে প্রবেশের কোনো যোগসূত্র আছে কি না এবং বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের বিষয়গুলো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করতে আরও তদন্ত প্রয়োজন। বিশ্লেষকদের মতে, পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তা, স্বাভাবিক ব্যবসা-বাণিজ্য ও যোগাযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে সশস্ত্র তৎপরতা ও চাঁদাবাজির অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইনের আওতায় আনার কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।