| ছবি: গিরিকণ্ঠ
পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের এক বিশেষ ভৌগোলিক ও সামাজিক বাস্তবতার অঞ্চল, যেখানে বাঙালি ও বিভিন্ন উপজাতি জনগোষ্ঠীর মিশ্র বসবাস। যোগাযোগ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, শিক্ষা-স্বাস্থ্যসেবার অপ্রতুলতা এবং কর্মসংস্থানের অভাবে এই অঞ্চলের যুবসমাজ দীর্ঘদিন ধরে নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এই বাস্তবতা মাথায় রেখে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দীর্ঘদিন ধরে পার্বত্য অঞ্চলে শুধু নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন নয়, বরং উন্নয়ন ও সম্প্রীতির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। এরই ধারাবাহিকতায় গুইমারা, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি—এই চারটি রিজিয়নে আগস্ট থেকে ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত বিস্তৃত ধারাবাহিক পরিকল্পনা অনুযায়ী পরিচালিত কর্মমুখী প্রশিক্ষণ কার্যক্রম আজ পাহাড়ি যুবসমাজের জীবনে বাস্তব পরিবর্তনের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। যুগের চাহিদা মেটাতে বহুমুখী উদ্যোগ এই প্রশিক্ষণ তালিকায় রয়েছে ফুটবল কোচিং, মোবাইল মেরামত, যানবাহন মেকানিক্স, মিডওয়াইফ ও নার্সিং, এসি-ফ্রিজ মেরামত, গাড়ি চালনা, কৃষি প্রযুক্তি, যানবাহন রক্ষণাবেক্ষণ, ফ্রিল্যান্সিং, কম্পিউটার এবং সেলাই বা টেইলারিং প্রশিক্ষণ। একদিকে যেমন স্বাস্থ্যসেবা খাতে দক্ষ জনবল তৈরির লক্ষ্যে মিডওয়াইফ ও নার্সিং প্রশিক্ষণ একাধিক ব্যাচে পরিচালিত হচ্ছে, তেমনি অন্যদিকে তথ্যপ্রযুক্তি যুগের চাহিদা মেটাতে কম্পিউটার ও ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। আবার প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য মোবাইল, যানবাহন ও এসি-ফ্রিজ মেরামতের মতো ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ যুক্ত করা হয়েছে, যা প্রশিক্ষণার্থীদের সরাসরি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে দিতে পারে। পাহাড়ি অঞ্চলে প্রাতিষ্ঠানিক কারিগরি শিক্ষার সুযোগ কম থাকায় সেনাবাহিনীর এই উদ্যোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ শূন্যতা পূরণ করছে এবং একজন প্রশিক্ষিত ব্যক্তি নিজের পাশাপাশি পরিবার ও সমাজেও দক্ষতা ছড়িয়ে দিচ্ছেন। রিজিয়নভিত্তিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের বিস্তৃতি গুইমারা রিজিয়নে ১৮ আগস্ট থেকে ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত মোবাইল মেরামত প্রশিক্ষণ চলছে এবং মিডওয়াইফ ও নার্সিং প্রশিক্ষণ তিনটি ব্যাচে আগস্ট মাসজুড়ে পরিচালিত হচ্ছে, যদিও ফুটবল কোচিং ও যানবাহন মেকানিক্সের তারিখ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। বান্দরবান রিজিয়নে সেপ্টেম্বর ২০২৬ মাসে এসি-ফ্রিজ মেরামত, যানবাহন চালনা ও কৃষি প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ শুরু হচ্ছে এবং পরবর্তী মাসগুলোতে ক্রমান্বয়ে যানবাহন মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ, ফ্রিল্যান্সিং ও মিডওয়াইফ বা নার্সিং প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হবে। খাগড়াছড়ি রিজিয়নে মেকানিক্স, মোবাইল মেরামত, কম্পিউটার এবং মিডওয়াইফ বা নার্সিং প্রশিক্ষণ আগস্ট থেকে অক্টোবর ২০২৬-এর মধ্যে দুটি বড় ব্যাচে পরিচালিত হচ্ছে। রাঙামাটি রিজিয়নে মিডওয়াইফ, টেইলারিং, কম্পিউটার ও যানবাহন মেকানিক্স—এই চার খাতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে, যা পাহাড়ি যুব-যুবতীদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন ও সম্প্রীতির বার্তা এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম কোনো বিক্ষিপ্ত বা তাৎক্ষণিক উদ্যোগ নয়, বরং সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী ধাপে ধাপে পরিচালিত একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রয়াস। এর মাধ্যমে সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি অধিক সংখ্যক যুবক-যুবতী প্রশিক্ষণের সুযোগ লাভ করছেন। কারিগরি দক্ষতা, স্বাস্থ্যসেবা, তথ্যপ্রযুক্তি ও ক্রীড়া—এই বহুমুখী খাতের পাশাপাশি মিডওয়াইফ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলে মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু হ্রাসে এবং ফুটবল কোচিংয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মাঝে সৌহার্দ্য বৃদ্ধিতে অনন্য ভূমিকা রাখা হচ্ছে। পরিশেষে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এই কর্মমুখী প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পাহাড়ি যুবসমাজকে কেবল কর্মসংস্থানের পথই দেখাচ্ছে না, বরং তাদের আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদাবোধ বৃদ্ধি করে পার্বত্য অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদী শান্তি, সম্প্রীতি ও টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি আরও বেশি মজবুত করে তুলছে।